চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ এক হৃদয়বিদারক ও অমানবিক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সৎ ভাইবোনদের মধ্যে দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে বৃদ্ধ বাবার মৃত্যুর পরও তার মরদেহ দাফন করা সম্ভব হয়নি। সন্তানদের পারস্পরিক বিরোধে মৃত্যুর ৩৪ ঘণ্টা পার হলেও মরদেহ বাড়ির উঠানে একটি ফ্রিজারের ভেতরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাটি ঘটে রোববার (২১ ডিসেম্বর) হাটহাজারী পৌর সদরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। এর আগে শনিবার (২০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টার দিকে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় মারা যান মো. সেকান্দর (৭০)। তিনি উপজেলার পূর্ব মেখল ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দানা মিয়া সওদাগর বাড়ির মরহুম নকশু মিয়ার বড় ছেলে। মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী, সন্তান ও অসংখ্য আত্মীয়স্বজন রেখে যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জীবদ্দশায় মো. সেকান্দর তার সকল স্থাবর সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার সন্তানদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। এই বিষয়টি প্রথম সংসারের সন্তানদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দেয়। তারা অভিযোগ করেন, বাবার জীবদ্দশায় তাদের সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে এবং সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
বাবার মৃত্যুর পর শনিবার সকালে দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানরা জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি শুরু করলে প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা তাতে বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে দাফন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে মরদেহটি বাড়ির উঠানে একটি ফ্রিজারে রেখে দেওয়া হয়, যা মানবিক ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।
বৃদ্ধের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে আয়শা অভিযোগ করে বলেন,
“আমাদের বাবা জীবিত থাকতেই সব সম্পত্তি দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার সন্তানদের নামে লিখে দিয়েছেন। এতে আমরা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্য সম্পত্তির সুষ্ঠু সমাধান না হবে, ততক্ষণ আমরা বাবার লাশ দাফনে সম্মতি দেব না।”
অন্যদিকে দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান ইমতিয়াজ বলেন,
“মৃত ব্যক্তিকে দ্রুত দাফন করা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। সম্পত্তির বিষয়টি আলাদা করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু লাশ নিয়ে এভাবে টানাটানি করা খুবই দুঃখজনক।”
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে এসে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তারা দ্রুত মরদেহ দাফন এবং পরবর্তীতে আইনানুগভাবে সম্পত্তি বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানান।
খবর পেয়ে হাটহাজারী মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জালাল ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি জানান,
“উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা চেষ্টা করছি যেন পরিস্থিতি শান্ত থাকে এবং মরদেহ দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা করা যায়। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি পারিবারিক বিরোধ নয়, বরং সমাজে সম্পত্তি নিয়ে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। তারা মনে করেন, সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়টি আইনি পথে সমাধান হওয়া উচিত, কিন্তু মৃত ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করা সবার আগে প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর আশা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দ্রুত এই সংকটের অবসান ঘটবে এবং মরহুম মো. সেকান্দরের মরদেহ যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হবে।